অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণার নতুন মাত্রা…

বিশেষ প্রতিনিধিঃ এস এম আকাশ
  • Update Time : শনিবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৩
  • ৮৫ Time View

অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণার নতুন মাত্রা কমান্ডার খন্দকার আল-মাইন: প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বাজারে গিয়ে যাচাই-বাছাই করে সুলভমূল্যে নিজেদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়-বিক্রয় করত। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন হতে থাকে। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য বাজার ব্যবস্থায় যোগ হয় সুপারশপ, শপিংমল, সুপার মার্কেট, মেগামল। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নগদ অর্থ লেনদেনের বিকল্প হিসেবে চালু হয় ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা। বাজারে গিয়ে সরাসরি পণ্য ক্রয়ের পাশাপাশি মানুষজন বর্তমানে অনলাইনে পণ্য অর্ডার করে ঘরে বসেই তা হাতে পেয়ে যাচ্ছে।সরাসরি পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতারা বিভিন্ন পণ্য যাচাই-বাছাই করে কাঙ্ক্ষিত পণ্য ক্রয় করতে পারে। কিন্তু অনলাইনে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতার অনলাইনে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পণ্য অর্ডার করতে হয়। সরাসরি পণ্য যাচাই-বাছাই করার সুযোগ না থাকায় কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি কাঙ্ক্ষিত পণ্য সরবরাহ না করে অর্থ আত্মসাৎ বা নিম্নমানের পণ্য সরবরাহসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। তাই অনলাইন কেনাকাটায় ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে অনলাইনে কেনাকাটার প্রচলন ও জনপ্রিয়তার কারণ : সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে অনলাইনে কেনাকাটার প্রচলন শুরু হলেও দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উন্নয়নের ফলে এর ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় এবং করোনাকালে এটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। অনলাইনে ঘরে বসে কয়েক ক্লিকে সহজেই পণ্য ক্রয় করা যায়, বাইরে যাওয়া লাগে না; পণ্য বহন বা দরদামও করতে হয় না। অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিক্রেতার দেওয়া পণ্য সম্পর্কিত তথ্যাদি ও কাস্টমার রিভিউ দেখে পণ্যের গুণাগুণ এবং মূল্য নিয়ে সহজেই ধারণা পাওয়া যায়। মোবাইল ব্যাংকিং, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড বা ক্যাশ অন ডেলিভারির মাধ্যমে পণ্যের দাম পরিশোধ করা যায়; মার্কেটপ্লেসগুলোতে থাকে বিভিন্ন ধরনের অফার/ডিসকাউন্ট। কোনো দোকান বা শোরুমের প্রয়োজন না থাকায় দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে পণ্য ক্রয়/বিক্রয় করা যায়। অনলাইন শপ যেমন—বিভিন্ন ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেস যেমন—দারাজ, চালডাল, রকমারি, ফুডপান্ডাসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতারা ভার্চুয়ালি পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করছে। গৃহস্থালির যে কোনো উপকরণ থেকে শুরু করে পোশাক, বই-পুস্তক, ইলেকট্রনিকস পণ্য এমনকি গাছের চারা, গবাদি পশুও এখন অনলাইনে কেনা যাচ্ছে। এসব কারণে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেই অনলাইনে কেনাকাটার প্রতি আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশে ই-ক্যাব নিবন্ধনকৃত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় দুই হাজার; ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত ৫০ হাজারের অধিক পেইজ/প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সূত্রমতে, ২০২২ সালে দেশের ই-কমার্স বাজারের আকার ছিল প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকার, যা ২০২৬ সাল নাগাদ দেড় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনলাইন কেনাকাটায় মানুষ কীভাবে প্রতারিত হচ্ছে : দেশে অনলাইন কেনাকাটার বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেস/শপে পোশাক, ইলেকট্রনিকস পণ্য, খাদ্যদ্রব্যসহ বিভিন্ন ভালোমানের পণ্যের ছবি ও বর্ণনা দিয়ে ছেঁড়া, নষ্ট, পচা বা নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের কারণে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছে। ভুয়া কাস্টমার রিভিউর কারণে গ্রাহকদের সহজেই প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সময়ের চেয়ে গ্রাহকের কাছে বিলম্বে পণ্য সরবরাহ করা হয়। মাঝেমধ্যে পেমেন্টের পর কাঙ্ক্ষিত পণ্য ডেলিভারি না দিয়ে গ্রাহকের নম্বর বা আইডি ব্লক করে দিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও পাওয়া যায়। অনেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কার্যালয়, শোরুম বা কাস্টমার সার্ভিস না থাকায় ক্রেতারা কেনাকাটা-পরবর্তী বিক্রয়োত্তর সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কিছু প্রতিষ্ঠানকে বিশাল ছাড়, ক্যাশব্যাক ও বিভিন্ন ধরনের অফার দিয়ে গ্রাহকদের প্রলুব্ধ করে প্রতারণা করতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে কিছু প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্রেতার কাছে পণ্য সরবরাহ করে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের পর বিপুলসংখ্যক ক্রেতার অর্থ হাতিয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার নজিরও রয়েছে। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, ইভ্যালিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে এরই মধ্যে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অপ্রতিষ্ঠিত সাইট/শপ কর্তৃক গ্রাহকের ব্যাংকিং তথ্যসহ ব্যক্তিগত তথ্য চুরি বা বিভিন্ন ফিশিং লিঙ্কের মাধ্যমে তাদের আইডি ও প্রয়োজনীয় তথ্যাদিও হ্যাক করা হচ্ছে।

প্রতিকার : অনলাইনে যে কোনো ধরনের কেনাকাটার ক্ষেত্রে ক্রেতাকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। কেনাকাটার সময় বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, ওয়েবসাইট/পেইজের URL সংরক্ষণ করতে হবে; শপ/পেজের স্ক্রিনশট, অর্থ পরিশোধ ও অর্ডার কনফার্ম সংক্রান্ত স্ক্রিনশট, চ্যাটিংয়ের স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতারণা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদিসহ দ্রুত নিকটস্থ থানায় জিডি/অভিযোগ করতে হবে। পাশাপাশি, জিডি/অভিযোগের কপি নিয়ে ভুক্তভোগী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সাইবার সেলেরও সহায়তা নিতে পারেন। অপরাধীকে শনাক্ত করা গেলে পরবর্তীকালে ভুক্তভোগীরা প্রতারকদের বিরুদ্ধে মামলা করার মাধ্যমে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবেন। এ ছাড়া, ভুক্তভোগী ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ বা আদালতে প্রতারণার মামলা করতে পারেন।
সতর্কতা : অনলাইনে যে কোনো ধরনের কেনাকাটার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করে পণ্য ক্রয় না করে যাচাই-বাছাই করে পণ্য ক্রয় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত/জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেস বা পেইজ থেকে পণ্য কেনার চেষ্টা করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী অফিস আছে কি না, বিক্রেতার আইডি সঠিক কি না, ওয়েবসাইটের অথেনটিসিটি নিশ্চিতকরণে এসএসএল (Secure Sockets Layer) সার্টিফাইড কি না, তা যাচাই করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, পরিচিতি, যোগাযোগের নম্বর সংরক্ষণ এবং গ্রাহকদের রিভিউ দেখতে হবে; রিভিউগুলো ভুয়া কি না, তাও যাচাই করতে হবে। অল্প দাম, বিশাল ছাড়, ক্যাশব্যাক বা অন্য কোনো চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে প্রলুব্ধ হওয়া যাবে না। পণ্যের বর্ণনা, ছবি, ভিডিও দেখার পাশাপাশি অন্যান্য মার্কেটপ্লেসে পণ্যটির দাম ও গুণাগুণ যাচাই করুন।
ডেলিভারি টাইম, ত্রুটিপূর্ণ পণ্য ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া, রিফান্ড পলিসি ও বিক্রয়োত্তর সেবা সম্পর্কিত তথ্যাদি জানতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির চ্যাটবক্সে গিয়ে চ্যাটিং করে পণ্য সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যাদি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে যারা পণ্যটি সম্পর্কে জানেন তাদের থেকে পরামর্শ নিন। ব্যক্তিগত/সংবেদনশীল কোনো তথ্য শেয়ার না করে ক্যাশ-অন ডেলিভারিতে পণ্য ক্রয় করলে অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। প্রতিষ্ঠিত বা নিরাপদ মার্কেটপ্লেস ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে আগেই পেমেন্ট করা যাবে না। বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ও পেমেন্ট পদ্ধতি নিরাপদ হলে সে ক্ষেত্রে অনলাইনে পেমেন্ট করা যেতে পারে। পণ্য ডেলিভারি পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই করে তার কোনো ত্রুটি পেলে সেটি উল্লেখপূর্বক পণ্যটি ফেরত পাঠাতে হবে। প্রতারিত হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দ্রুত অভিযোগ করতে হবে। লোভনীয় অফার সম্পর্কিত পপ-আপ বা ইমেইলে প্রাপ্ত ফিশিং লিঙ্কে ক্লিক করা কিংবা পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার করে অনলাইনে কেনাকাটা না করাই উত্তম। অনলাইনে কেনাকাটার আগে আপনি যত সতর্ক ও সচেতন থাকবেন এবং যত বেশি যাচাই-বাছাই করবেন, ততই কমে যাবে আপনার প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা। আমাদের সবার সতর্কতা ও সচেতনতার মাধ্যমেই অনলাইন কেনাকাটায় গ্রাহকদের প্রাপ্য সেবা নিশ্চিত এবং সব ধরনের প্রতারণা নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অনলাইন মার্কেটপ্লেস প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

পরিচালক- লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং-র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category